ঢাকা , রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ , ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাশিমপুর কারাগার/চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান ছাড়াই চলছে বন্দিদের হাসপাতাল

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৩-০৮-২০২৬ ০২:২১:২৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৩-০৮-২০২৬ ০২:২১:২৫ অপরাহ্ন
কাশিমপুর কারাগার/চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান ছাড়াই চলছে বন্দিদের হাসপাতাল



কোটি কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, অপারেশন থিয়েটার আর প্যাথলজি ল্যাব—সবকিছু থাকলেও শুধু চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানের অভাবে দুই দশকেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর ২০০ শয্যার হাসপাতাল। ফলে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার বন্দির উন্নত চিকিৎসাসেবা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, আর মূল্যবান যন্ত্রপাতিগুলো অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

জানা গেছে, গাজীপুরের কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সে মোট চারটি কারাগার রয়েছে। এরমধ্যে কারাগার-২ এ সব ধরনের রোগের চিকিৎসার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয় ২০০ শয্যার হাসপাতাল। বাকি তিনটি কারাগারের বন্দিদের চিকিৎসাও এখানে হয়। কিন্তু নির্মাণের পর থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ না হওয়ায় এর কার্যক্রম সীমিত রয়েছে। হাসপাতালের জন্য তত্ত্বাবধায়ক, দুজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, নয়জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, পাঁচজন আবাসিক চিকিৎসক, চিকিৎসা কর্মকর্তা, দুজন সহকারী সার্জন, একজন প্যাথলজিস্ট, দুজন রেডিওলজিস্ট, দুজন ফার্মাসিস্ট ও একজন ডিপ্লোমা নার্স


কারাগার সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুজন চিকিৎসককে কাশিমপুর কারাগারের হাসপাতালে প্রেষণে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুরের সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে আরও দুজন চিকিৎসক দিয়ে কোনোভাবে সেবা চালানো হচ্ছে। তারা সপ্তাহে দু-চারদিন আসেন। সকালে এসে দুপুরে চলে যান। বাকি সময়ে কোনো চিকৎসকই থাকে না। অথচ কারাগারে থাকা বন্দিদের মধ্যে যক্ষ্মা, টাইফয়েড, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। বিশেষ করে হৃদ্রোগে আক্রান্ত বন্দিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন হলেও কাশিমপুর থেকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে যানজটসহ নানা কারণে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এতে সংকটাপন্ন রোগীদের ঝুঁকি বাড়ে।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের ২০০ শয্যার হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিভিন্ন বিভাগের জন্য মোট ৮ কোটি ৭৪ লাখ ২৯ হাজার ৪০১ টাকার সরঞ্জাম কেনার হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে রেডিওলজি ও ইমেজিং, ল্যাবরেটরি ও প্যাথলজি এবং অর্থোপেডিক বিভাগের সরঞ্জামে।

নথি অনুযায়ী, রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের সরঞ্জামের মূল্য ২ কোটি ২৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮০৬ টাকা। এর মধ্যে এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, এক্স-রে ফিল্ম প্রসেসরসহ বিভিন্ন যন্ত্র রয়েছে। ল্যাবরেটরি ও প্যাথলজি বিভাগের সরঞ্জামের মূল্য ১ কোটি ৪৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ টাকা। এই তালিকায় ব্লাড গ্যাস অ্যানালাইজার, ইলেকট্রোলাইট অ্যানালাইজার, কোয়াগুলেশন অ্যানালাইজার, মাইক্রোস্কোপ ও ইনকিউবেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্র রয়েছে।

অর্থোপেডিক বিভাগের সরঞ্জামের মূল্য ১ কোটি ৪১ লাখ ১০ হাজার ৫৬৬ টাকা এবং সার্জারি বিভাগের ৯৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭২ টাকা। অপারেশন থিয়েটার ও অ্যানেসথেশিওলজি বিভাগের জন্য ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার ৫ টাকা, ডেন্টাল বিভাগের জন্য ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৪ টাকা এবং ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগের জন্য ৪০ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ টাকার সরঞ্জামের হিসাব রয়েছে।

নথিতে ২০১১ সালের ৮ মার্চের একটি সরবরাহসংক্রান্ত কাগজও পাওয়া গেছে। এতে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহের তথ্য রয়েছে। হাসপাতালের ইনভেন্টরি তালিকাতেও এক্স-রে মেশিন, কম্পিউটারাইজড রেডিওগ্রাফি সিস্টেম, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামের উল্লেখ রয়েছে।

হাসপাতালটিতে এত চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকার পরও কোনো বন্দি অসুস্থ হলে নেওয়া হয় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তবে সেখানেও বন্দিদের চিকিৎসায় রয়েছে সীমাবদ্ধতা। হাসপাতালটিতে বন্দিদের জন্য আলাদা প্রিজন সেল বা প্রিজন ওয়ার্ড নেই। ফলে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

কারাগারের কর্মকর্তারা জানান, দেশের অন্যান্য অনেক কারাগার থেকে হাসপাতালের দূরত্ব পাঁচ থেকে সাত মিনিটের। কিন্তু কাশিমপুর কারাগার থেকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে অনেক সময় প্রায় এক ঘণ্টা লাগে। গুরুতর রোগীদের নিয়ে তখন সমস্যায় পড়তে হয়। হাসপাতালে প্রিজন সেল ও প্রিজন ওয়ার্ড থাকলে এই সমস্যা অনেকটাই কমে আসত। পাশাপাশি কাশিমপুরের কারা হাসপাতালে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ করা হলে বন্দিদের চিকিৎসাসেবা আরও সহজ ও কার্যকর হতো।

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের জেল সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, কারারক্ষীদের মধ্যে এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করা কয়েকজনকে বাছাই করে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং পড়ানো হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে একজনকে রেডিওলজিস্ট, দুজনকে ফার্মাসিস্ট এবং একজনকে ডিপ্লোমা নার্স হিসেবে কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে চিকিৎসক সংকটের সমাধান হয়নি।

কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় ৩ হাজার ৫০০, কারাগার-২ এ প্রায় ৫ হাজার ৪০০, কারাগার-১-এ প্রায় ২ হাজার এবং কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে প্রায় ৭০০ বন্দি রয়েছেন। চার কারাগারে প্রায় ১১ হাজার ৬০০ বন্দির জন্য এত বড় হাসপাতাল ও কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও জনবল সংকটে তার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বন্দিরা, আর অব্যবহৃত পড়ে থাকা সরঞ্জাম নিয়ে তৈরি হয়েছে অপচয় ও নষ্ট হওয়ার শঙ্কা।

গাজীপুরের সিভিল সার্জন মামুনুর রহমান বলেন, বিভিন্ন উপজেলা থেকে চারজন চিকিৎসককে প্রেষণে দেওয়া হয়েছে। তারা পালা করে দায়িত্ব পালন করেন।

কাশিমপুর কারাগার-২ এর জেল সুপার হালিমা খাতুন বলেন, দেশের অন্যান্য অনেক কারাগার থেকে হাসপাতালের দূরত্ব পাঁচ থেকে সাত মিনিটের। কিন্তু কাশিমপুর কারাগার থেকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দূরত্ব অনেক। ফলে গুরুতর রোগীদের নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। কাশিমপুরের কারা হাসপাতালে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ করা হলে বন্দিদের চিকিৎসাসেবা আরও সহজ ও কার্যকর হতো।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ